কারও কারও জন্মই হয় উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য। তিনি সেরকমই একজন। বাবার দিকে বংশের কেউ কখনো উদ্যোক্তা হওয়ারদুর্গম গিরি, কান্তার মরু“র  পথে হাঁটেন নি। উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন কোথা থেকে যে তার মাথায় ভর করলো তা তিনি নিজেই নিশ্চিত নন। চাকুরীর পাশাপাশি নিজের ছোট্ট স্বপ্নকে লালন করতে গিয়ে কখন যেন নিজের ভিতরেই শুনতে পেলেন সেই অমোঘ ডাক। সাহস করে নেমে পড়লেন উদ্যোক্তা হওয়ার দুস্তর পথে। স্বপ্নের যে ছোট্ট ডিঙ্গি নৌকা নিয়ে তিনি শুরু করেছিলেন ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ মহাসমুদ্রের বুকে যাত্রা; কালে কালে সেটিই যেন আজ হয়ে উঠেছে এক বিশাল কর্মোদ্যোগ।

Storrea’ পক্ষ থেকে আমাদের দেশের এই রকম সাধারণের অসাধারণ গল্প শোনার জন্য আমরা কথা বলেছি হালের ফ্যাশন জগতের সাড়া জাগানো নামShoilee কর্ণধার তাহমিনা শৈলীর সাথে। কথায় কথায়  উঠে আসে তার বড় হয়ে উঠার গল্প, উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নেরগল্প আর বর্তমান কর্মব্যস্ত জীবনের গল্প।

 

প্রথম পাঠ: দর্পণে পিতার মুখ

শৈলী আপুকে আমরা প্রথমেই জিজ্ঞেস করি তার ছেলেবেলার কথা। শিশুর পিতা যে সব শিশুর অন্তরেই ঘুমিয়ে থাকে। তাই ভাবছিলাম এমন কোন উপাদান কি তার শৈশবে ছিল কিনা যা তার আজকের উদ্যোক্তা জীবনকে পাকেচক্রে বেঁধে ফেলেছে? তার বেড়ে উঠা ঈশ্বরদীর Sugarcane Research Institute এ। বাবা ছিলেন ইন্সটিটিউট এর Art & Photography বিভাগের প্রধান। চারুকলা থেকে পেইন্টিং এর উপর ডিগ্রী নেয়া, লন্ডনে ফটোগ্রাফির উপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করা বাবার স্বভাবজাত শিল্পী স্বত্বা তার বড় হয়ে উঠার নিত্য অনুষঙ্গ। সবাই যখন স্কুলে পাশ করার জন্যে আম কিংবা আনারস, আপেল আঁকা শিখছে তখন তাকে করতে হয়েছে বাবার অদ্ভুত সব আর্ট অ্যাসাইনমেন্ট। টিভি দেখছেন সবাই বসে বসে; বাবা বলে বসলেন টিভিটাই আঁকো। কিংবা বর্ষাস্নাত কোন দিন এর অলস দুপুর, বিকেল গড়িয়ে যখন রাত; তখন বাবা হয়তো বলে বসলেন, আজকের দিনটাকেই এঁকে ফেলো। এই করতে করতে কবে যে তিনি নিজেই স্বভাব শিল্পী হয়ে উঠলেন তা বোধহয় তিনি নিজেও জানতেন না।

শখেই শুরু: শখের শিল্পীর “শৈলী”

শুরুটা কি করে করলেন? জানতে চাই তার কাছে। পড়াশোনা করেছেন মার্কেটিং এর মত কঠিন বাস্তববাদী বিষয়ে। ঠিক কিভাবে আসলেন আজকের এই পেশা কিংবা নেশায়? জানালেন মার্কেটিং এর খটমট বিষয়ে পড়াশোনা করলেও মনে যার সৃষ্টির আনন্দ তাকে কি আর কোন কিছু ঠেকিয়ে রাখতে পারে? তাই চাকুরীও করেছেন সৃষ্টিশীল মাধ্যমে। সংবাদপত্র থেকে শুরু করে রেডিও, টিভি, অ্যাড ফার্ম কোনটাই বাদ যায়নি তার লিস্ট থেকে। চূড়ান্ত পেশাদারিত্বের জায়গায় কাজ করে নিজেকে শাণিত করেছেন প্রতিনিয়ত। শখের বশেই ঘরে বসে করতেন হ্যান্ডিক্রাফটের কাজ। কখনো শাড়িতে কাজ করে ফুটিয়ে তুলছেন নিজের চাওয়া পাওয়া। কখনো কিনে আনা গয়নায় নিজেই দিচ্ছেন নিজের হাতের ছোঁয়া। আর হবেই বা না কেন? মা খালারা যে সবাই হাতের কাজে সিদ্ধহস্ত। মা, খালা, বান্ধবীদের উৎসাহের অন্ত নেই। এক জন্মদিনে সব বান্ধবীকে নিজের ডিজাইন করা গয়না উপহার দিয়ে বসলেন। বান্ধবীদের সাথে ছোট গ্রুপে নিয়ে বসে যেতেন কোন একটা ডিজাইনের কাজে। শুরু করেছিলেন ফেসবুকে জুয়েলারি পেইজ দিয়ে। এরপর একে একে যুক্ত হল শাড়ি, পাঞ্জাবী, দোপাট্টা, মায়ের হাতের বানানো আচার। শুরু হল শৈলীর শিল্পযাত্রা।

রঙের খনি যেখানে দেখেছি, রাঙিয়ে নিয়েছি মন

আপুর কাছে জানতে চাই এই যে এতো এতো জায়গায় চাকুরীর অভিজ্ঞতা, ঠিক কবে থেকে নিজের চাকুরী দেয়ার ইচ্ছাটা জাগ্রত হল? আপু বললেন, “আসলে যেখানেই চাকুরী করি না কেন, সব জায়গায় মনে হয়েছে আমি শিখছি। আর কিভাবে নিজের কোম্পানিতে এইগুলো কাজে লাগানো যায় তা মাথায় নোট করে নিচ্ছি।” তবে কোন জ্ঞানই যে আসলে বৃথা যায়না এটা তিনি পরে অনুভব করেছেন নিজের কোম্পানি তৈরি করার সময়। নতুন উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে আপু বলেন, “যেকোন উদ্যোক্তাদের মধ্যেই আসলে এক ধরনের ক্ষুধা থাকে। নিজের কোন সৃষ্টির যে অপার আনন্দ সেটি পাওয়ার জন্য একটা তাড়না সব ছোট বড় উদ্যোক্তার মধ্যেই আছে। যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে তবেই আসলে শুরু করা উচিত।” ছোট লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে বলেন তিনি। প্রথমে নিজের পুঁজি নিয়ে শুরু করলেও পরে ব্যবসার সম্প্রসারণ এর জন্যে নিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ। ২০১২ তে গুলশানে নিজের শোরুম নিয়ে শৈলী ফেসবুকের ক্ষুদ্র গণ্ডি ছেড়ে বড় পরিসরে যাত্রা শুরু করে। বর্ধিত চাহিদার যোগান দিতে এখন যা কারওয়ান বাজারের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় এসে থিতু হয়েছে। সঞ্চিত অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে তৈরি করেছেন আপন আনন্দযজ্ঞ। তার ফ্যাক্টরি তাই কোন প্রাণহীন জীবাশ্ম নয়। এক আনন্দমেলা। কেউ ঝাল মুড়ি খাচ্ছেন, কেউ গান করছেন, কেউবা আবার আপন মনে সুর ভাঁজছেন। এভাবেই যত্ন, মমতার ছোঁয়ায় তৈরি হয়ে একটি প্রোডাক্ট আসে বাজারে। নিজে নারী বলে সমাজে নারীশ্রমের মূল্যটা অনুভব করেন আলাদাভাবে। তার কোম্পানি রুলেই তাই আছে যত কর্মচারী থাকবে তার ৮০%ই হবে নারী। বর্তমানে তার ৩৭ জন কর্মচারী। তার মধ্যে ৩৫ জনই মেয়ে।

 

Untitled-3

এই স্বপ্নের জগৎ চিরদিন রয়

আপুকে জিজ্ঞেস করি তার স্বপ্নের সীমারেখা কোথায়? কতদূর গিয়ে থামতে চান। জানালেন, স্বপ্নের তো কোন সীমারেখা নেই। তবে বাস্তববাদী কিছু স্বপ্ন তিনি রেখে দিয়েছেন নিজের এই সৃষ্টির জন্যে। অনেক বড় লক্ষ্য আছে, তবে আপাতত ছোট ছোট স্বপ্নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে চান। নিয়মিত দেশী বিদেশী মেলায় অংশগ্রহণ করছেন নিজের পণ্য নিয়ে। দিল্লীতে International Trade Fair এ গিয়ে বুঝতে পেরেছেন ব্যবসার বৈশ্বিক মানদণ্ড। জানালেন, “সারা বিশ্বের ইকমার্সের সাথে তুলনা করলে মনে হয় আমরা যেন এখনো হাঁটতে শিখছি। পাড়ি দিতে হবে অনেকটা পথ।” দক্ষিণ এশিয়ার সেরা জুয়েলারি ব্র্যান্ড হতে চান। জানাতে চান সারা বিশ্বকে এই অঞ্চলের মানুষ তাদের আধ্যাত্মিক, আত্মিক সংযোগে কি অসাধারণ সৃষ্টিশীল সব পণ্য তৈরি করে চলেছে। জীবন দর্শনের প্রশ্নে জানেন, জীবনের বাঁকে বাঁকে অনেক চমক অপেক্ষা করছে তার জন্যে। তিনি শুধু নিজের স্বপ্নে বিশ্বাস রেখে যেতে চান আর কাজ করে যেতে চান নিরলসভাবে আপন লক্ষ্যে। ২০১৬ সালের একটি স্বপ্নের লক্ষ্যমাত্রা ইতিমধ্যে অর্জিত হয়েছে তার। কলকাতায় শৈলীর একটি ফ্যাক্টরি খুলেছেন। আশা করছেন এখান থেকেই বাংলাদেশের গণ্ডী ছাড়িয়ে বিশ্বের পথে হাঁটা শুরু করবেন।

শৈলী আপুর সাথে কথা বলে একধরনের আত্মপ্রত্যয় মনের মাঝে জন্ম নেয়। মনে হয় যেন সৎভাবে আপন স্বপ্নে বিশ্বাস করলে আসলে কোন বাধাই দুর্লংঘ্য নয়। নিজের সামর্থ্যে আস্থা থাকলে স্বপ্ন দেখতে আর কোন বাঁধা নেই। শৈলীর অগ্রযাত্রা দিন দিন গতিশীল হোক, টিম স্টোরিয়ার পক্ষ থেকে এই শুভকামনা।

শৈলীর স্রষ্টা তাহমিনা শৈলী আপুর সম্বন্ধে বিস্তারিত জানতেঃ http://shoilee.com

শৈলীর ফেসবুক পেইজঃ https://www.facebook.com/shoileezone/

 

 

হতে চাই একজন সফল উদ্যোক্তা

(Visited 2,796 times, 1 visits today)
0

Comments