আমাদের দেশে হরহামেশাই দেখা যায় একই প্রোডাক্টের দাম একেক অনলাইন শপে একেকরকম। বেশিরভাগ অনলাইন ব্যাবসায়ী সব দিক চিন্তা না করে নিজের মনের মতো একটা দাম ঠিক করে থাকেন। অনুমান করে দাম ঠিক করার বড় অসুবিধা হলো সব রকম কস্ট ফ্যাক্টর প্রোডাক্টদের দামের মধ্যে যুক্ত হয় না, ফলে অনেকসময় এমন হতে পারে যে আপনার বিজনেস পরিচালনার খরচই  উঠে আসছে না। প্রোডাক্ট সোর্সিংয়ের খরচ এবং প্রোডাক্টের দাম নির্ধারণের ব্যাসিক কিছু কৌশল জেনে নিন এই আর্টিকেল থেকে।

প্রোডাক্টের কস্ট/খরচ কত?

প্রোডাক্টের দাম বা বিক্রয়মূল্য কতো হবে সেটার অনেকটাই নির্ভর করে প্রোডাক্টটির পেছনে আপনার কত খরচ হয়েছে সেটার উপর। তাই কোন প্রোডাক্ট বিক্রি করবেন সেটা ঠিক করার জন্য প্রোডাক্টটি তৈরী করতে বা সংগ্রহ করতে কেমন খরচ পড়বে সেটা পর্যালোচনা করে দেখা জরুরি। মূলত দুইভাবে প্রোডাক্ট সংগ্রহ করা যাবে:

 

  • নিজে তৈরী করা: আমাদের দেশে অনলাইন সেলারদের মধ্যে যারা ক্র্যাফট বা ঘর সাজানোর জিনিস নিয়ে কাজ করেন তারা নিজেরা প্রোডাক্ট উৎপাদন করে থাকেন। এখানে মূল খরচ হচ্ছে কাঁচামাল কেনা, শ্রমিকের পারিশ্রমিক ও  ডেলিভারি চার্জ।

 

  • হোলসেলার বা Supplier দের থেকে সংগ্রহ করা: আমাদের দেশে  হোলসেলারদের থেকেই বেশিরভাগ অনলাইন ব্যবসায়ী প্রোডাক্ট সোর্স করে থাকেন। এখানে মূল খরচ হচ্ছে প্রোডাক্টের দাম, প্রোডাক্ট নিজের ইনভেন্টরিতে মজুদের খরচ আর ডেলিভারি চার্জ।

 

প্রোডাক্টের পেছনে আপনার খরচের পাশাপাশি কিভাবে আপনি প্রোডাক্টটি সোর্স করছেন তার উপর অনলাইন বিজনেসের সফলতা অনেকখানি নির্ভর করে। যদি আপনার ট্যালেন্ট ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকে তাহলে নিজে প্রোডাক্ট তৈরী করে অনলাইনে বিক্রি করলে আপনার কাস্টমার থেকে পণ্য এবং আপনি নিজে প্রশংসা পাবেন। নিজে প্রোডাক্ট উৎপাদন করলে কতগুলো বানাবেন, দাম কত রাখবেন, প্রোডাক্টের গুণগত মান কেমন হবে সেগুলো সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়। টি-শার্ট, ঘর সাজানোর জিনিস, ছেলে/মেয়েদের ড্রেস এই ধরণের প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ করতে চাইলে নিজে উৎপাদন করা সম্ভব। তবে নিজে উৎপাদন করলেও কিছু বিজনেস ফ্যাক্টর অবশ্যই মাথায় রাখা জরুরি:

 

  • আপনার কাঁচামাল কার থেকে সংগ্রহ করবেন এবং সেগুলো কিভাবে সংগ্রহ করবেন?
  • কাঁচামালের দাম কত পড়বে আর কাঁচামালের দামের উপর তৈরী করা প্রোডাক্টের দামের কতটা প্রভাব থাকবে?
  • প্রোডাক্ট তৈরী করতে কত সময় লাগে? মার্কেট চাহিদা অনুযায়ী আমি প্রোডাক্ট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রোডাক্ট তৈরী করতে পারবো তো?
  • যদি কাস্টমার কাস্টম বানিয়ে দিতে বলে তাহলে ঠিকভাবে দিতে পারবো তো?

 

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পজিটিভ হলে নিজে প্রোডাক্ট তৈরী করে বিক্রি করাটাই শ্রেয়। এখানে মূল সুবিধা হলো থার্ড পার্টির উপর আপনার প্রোডাক্ট সংগ্রহ করার জন্য আপনাকে নির্ভর করতে হচ্ছে না। উৎপাদন নিজে করলে প্রোডাক্ট কস্টিংও কম হবে ফলে প্রফিট বেশি হবার সম্ভাবনা বেশি। তবে আপনার রেসপনসিবিলিটি একটু বেড়ে যাবে যেহেতু প্রোডাক্ট উৎপাদন ও বিক্রি দুইটি আলাদা বিষয়, তখন দুইদিকেই সময় দিতে হবে সঠিকভাবে বিজনেস চালানোর জন্য।

 

অপরদিকে যদি নিজে প্রোডাক্ট উৎপাদন করাটা আপনার জন্য সুবিধাজনক না হয় তাহলে হোলসেলার থেকে প্রোডাক্ট কিনে বিক্রি করতে হবে। সেক্ষেত্রে দায়িত্ব কিছুটা কমবে কিন্তু প্রোডাক্টের দাম ঠিক করা এবং চাহিদা অনুযায়ী সাপ্লাই দেবার ব্যাপারে আপনার নিজের কন্ট্রোল কমে যাবে। আর কতগুলো প্রোডাক্ট কিনে রাখবেন সেই সিন্ধান্তটাও বাজারের চাহিদা বুঝে নিতে হবে। এক্ষেত্রে আপনার হোলসেলারের সাথে  সহজ ও সুন্দর সম্পর্ক স্থাপন করাটা গুরুত্বপূর্ণ। পণ্যের রিটার্ন পলিসি, ডিসকাউন্ট এই বিষয়গুলো নিয়ে আগে থেকে হোলসেলারের আলাপ করে নিতে হবে যাতে কোনোভাবেই আপনার কাস্টমারের উপর নেগেটিভ প্রভাব না পরে।

 

প্রোডাক্ট সোর্স করার পরে সব থেকে মজার কাজ হলো প্রোডাক্টের দাম ঠিক করা। প্রোডাক্টের সঠিক দাম আপনাকে মার্কেটে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এবং প্রফিটেবল অনলাইন বিজনেস পরিচালনা করতে সহায়তা করবে।

 

কিভাবে প্রোডাক্টের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করবেন?

আমাদের দেশে হরহামেশাই দেখা যায় একই প্রোডাক্টের দাম একেক অনলাইন শপে একেকরকম। বেশিরভাগ অনলাইন ব্যাবসায়ী সব দিক চিন্তা না করে নিজের মনের মতো একটা দাম ঠিক করে থাকেন । অনুমান করে দাম ঠিক করার বড় অসুবিধা হলো সব রকম কস্ট ফ্যাক্টর প্রোডাক্টদের দামের মধ্যে যুক্ত হয় না, ফলে অনেকসময় এমন হতে পারে যে আপনার বিজনেস পরিচালনার খরচই  উঠে আসছে না। তাই প্রোডাক্টের দাম ঠিক করার আগে একটু ম্যাথ/অঙ্ক করে নিতে হবে।  নিচের চারটি ধাপ অনুসরণ করে খুব সহজেই লজিক্যালি প্রোডাক্টের দাম ঠিক করে ফেলা যাবে :

  • প্রথম ধাপঃ ওভারঅল প্রোডাক্টের খরচ নির্ধারণ করুন 

প্রোডাক্ট বিক্রির আগে কিছু খাতা কলমের হিসাব করে নেওয়া দরকার। পণ্য উৎপাদনের খরচ, বিপণন খরচ, সেলস খরচ, পরিবহন খরচ, ডেলিভারি খরচ ইত্যাদি।

আসুন একটি ছোট অঙ্ক করে দেখি, কিভাবে একটি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করবো। ধরুন আপনি চান ‘গেইম অফ থ্রোন্স’ সিরিজের একটি চরিত্র/ডায়লগ/হাউজ এর ডিজাইন নিয়ে বানানো হুডি বিক্রি করবেন। আনুমানিক ধরুন

— প্রত্যেকটি হুডির খরচঃ ১৮০-২২০ টাকা (নির্ভর করে কি পরিমাণ আপনি বানাবেন, মোটামুটি এই টাকার মধ্যে আপনি ভালো একটি হুডি পেয়ে যাবেন)

— প্রত্যেকটি হুডির বিক্রির পিছনে মার্কেটিং খরচঃ ১০০ টাকা

— প্রত্যেকটি হুডির বিক্রির পিছনে ইনভেন্টরি, লজিস্টিকস, ম্যানপাওয়ার খরচঃ ১০০  টাকা

— প্যাকেজিং খরচঃ ১০ টাকা

— ডিজাইন ও প্রিন্টিং খরচঃ ৫০ টাকা

 

সর্বমোট খরচ ঃ ২২০ + ১০০ + ১০০+ ১০ + ৫০ = ৪৮০ টাকা।

  • দ্বিতীয় ধাপঃ আপনার ব্যবসার কাঙ্ক্ষিত লাভের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করুন

এইবার এই পণ্য দিয়ে আপনি আসলে কত লাভ অর্জন করতে চান, সেই মানটি সেট করুন। কিছু ব্যাপার আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। যেমন ধরুন, আপনি কত সংখ্যক হুডি বিক্রি করবেন? এটি কি আপনার এককালীন ব্যবসা? আপনার লাভের মার্জিন আপনি বাজারের চলতি প্রতিযোগিতাকে হার মানাতে কত কম দামে বিক্রি করতে পারবেন? আপনার আসল লক্ষ্য কি, বেশি পরিমাণে বিক্রি করে লাভ তুলে আনা নাকি অল্প সংখ্যক বিক্রি করেই বেশি দাম রেখে লাভের অঙ্কটি তুলে আনবেন।

ধরুন, আপনি ঠিক করলেন আপনি লাভ করতে চান প্রতি হুডিতে ৩০% (কম পরিমানে বিক্রির চিন্তা মাথায় থাকলে নির্দিষ্ট পরিমান লাভ রাখার চিন্তাও করতে পারেন)।

তাহলে আপনার প্রত্যেকটি হুডির দাম দাঁড়াবে , ৪৮০ + ১৪৪ টাকা = ~৬৫০ টাকা, যা কিনা বাজারের চলতি দাম হিসেবে যথেষ্টই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। আপনি চাইলে আপনার লাভের মার্জিন অনুসারে হুডির দাম এদিক ওদিক করতে পারেন হাল্কা পাতলা। এর মধ্যে খেয়াল করে দেখুন চাইলে আপনার ডেলিভারি কস্ট ও অ্যাড করা আছে। চাইলে আপনি ফ্রি ডেলিভারিও অফার করতে পারেন। অথবা আরেকটু দাম বাড়িয়ে ফ্রি ডেলিভারি সুবিধা দিতে পারেন। এগুলো পুরোই আপনার পরিকল্পনার অংশ। আর লাভের অঙ্ক যদি বেশি রাখতে চান তবে কোন কোন জায়গায় খরচ কমাতে পারেন সেগুলো নিয়ে আরেকটু ব্রেইনস্টর্মিং করে রাখতে পারেন।

নিচের বিষয় গুলো অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যখন আপনি পণ্যের দাম নির্ধারণ করবেনঃ

  •  আপনার পণ্যের ভ্যালু এডিশনঃ ক্রেতা যখন পণ্য কিনে তখন সে শুধু পণ্যটাঈ কিনে না, সাথে যেন এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা কিনে। ক্রেতাকে বিশেষভাবে গণ্য মনে করানো বিক্রেতা হিসেবে আপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিশেষ আকর্ষণীয় কোন প্যাকেজিং, ফ্রি রিটার্ন সুবিধা এই ধরনের সুবিধা যোগ করে দিন পণ্যের সাথে। যদি আপনি এমন কিছু অফার করছেন যা আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীরা করছে না নির্ভয়ে তার জন্যে ও আপনি চার্জ করতে পারেন।
  • ওভারপ্রাইসিংঃ   ওভারপ্রাইসিং আপনার পণ্যের বিশ্বাস হারাবে। সাথে সেলস তো কমবেই। লোভের গুড় না যাতে পিঁপড়া খেয়ে ফেলে সেদিকে নজর দিতে হবে।
  • আন্ডারপ্রাইসিংঃ পণ্যের কম দাম আবার আপনার পণ্যের মান নিয়ে ক্রেতার মনে প্রশ্ন জাগাবে। এতে ব্র্যান্ডিং এর ও এক ধরনের ক্ষতি হতে পারে সময়ে অসময়ে।

 

অনলাইনে যেই প্রোডাক্টের ব্যবসাই করেন না কেন আপনার সোর্সিং যদি মজবুত না হয় এবং সঠিক কম্পিটিটিভ দামে যদি পণ্য বিক্রয় করতে না পারেন তাহলে লাভের মুখ দেখা কষ্টকর হয়ে যাবে। তাই ই-কমার্স ব্যবসার এই দুই দিকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করুন।

আপনার অনলাইন ব্যবসার জন্য স্টোরিয়ার পক্ষ থেকে রইল নিরন্তর শুভকামনা।

নিজের একটি অনলাইন ব্যবসা হোক আজই

(Visited 1,802 times, 1 visits today)
2

Comments