ঢাকায় কত হাজার টঙ এর দোকান আছে কোন ধারণা করতে পারেন কি? সেই টঙ এর দোকানে প্রত্যেকদিন কত হাজার গ্রুপ বৈকালিক কিংবা সান্ধ্য কিংবা রাত্রিকালীন আড্ডায় বসেন সেই হিসাবও বেশ কসরত করেই বের করতে হবে। বাঙ্গালী মাত্রই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এই আড্ডা। এতো এতো সময় এই আড্ডার পিছনে আমরা খরচ করি; দিনশেষের ক্লান্তি তাতে আমরা ভুলে যাই বটে, কিন্তু এর থেকে অনেক বড় কিছু করার কোন যোগসূত্র কি আমরা খুঁজে পাই?

এই ধরনের আড্ডায় বিষয়বস্তুর বিস্তৃতি থাকে খেলাধুলা, অর্থনীতি, রাজনীতি, ব্যবসা বাণিজ্য থেকে শুরু করে পড়ালেখা এমন কি বন্ধুর প্রেম কিংবা বিয়ের বিষয় পর্যন্ত। এই আড্ডাগুলো থেকে উঠে আসে কখনো কখনো নতুন দিক নির্দেশনা অথবা নতুন চিন্তার খোরাক। এরকম চা সিগারেটের আড্ডা থেকেই উঠে এসেছে সময়ের জনপ্রিয় মোবাইল এবং গ্যাজেটের অনলাইন দোকান Gadget Moneky BD.

আড্ডা, বন্ধুত্ব থেকে ব্যবসার চৌকাঠে

ঝিগাতলার নেসক্যাফের সামনের সেদিনের সেই আড্ডাটাও নিত্যনৈমিত্তিক আড্ডাই ছিল বন্ধুদের। সময়কাল আজ থেকে বছর দেড়েক আগে। একজন আরেকজনকে টিটকারি, কার কোন বান্ধবী কোথায় চলে গেলো, কিংবা রিয়াল মাদ্রিদ বার্সেলোনার এল ক্লাসিকোতে কি হতে পারে এমন সব সহজ কথাতেই সীমাবদ্ধ ছিল তাদের আড্ডা। কিন্তু সেদিনের শীতের দীর্ঘতর সন্ধ্যায় হঠাৎ আড্ডার মোড় ঘুরে যায়।

পাঁচ বন্ধু স্কুল এর সময় থেকেই একটি গ্রুপ হিসেবে ঘোরাফেরা করতেন। একেকজন একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলেও বন্ধুত্বের মাঝে চিড় ধরে নি কখনো। এই আড্ডাচ্ছলেই সবার সাথে সবার দেখা হতো। এমনি এক আড্ডায় বন্ধুরা মিলে নিজেরা কিছু করবার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু কি করবেন, কোন পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করবেন মাথায় ছিল না কোন আইডিয়াই। বন্ধুদের মাঝে জ্যাক ছিলেন সবচেয়ে করিৎকর্মা। Facebook এ Xiaomi ইউজারদের গ্রুপে প্রতিনিয়ত ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মত মানুষের বিভিন্ন হেল্প পোস্টে রিপ্লাই দিয়ে যেতেন। ভাবলেন এটিকেই পুঁজি করে গ্যাজেটের ব্যবসা শুরু করবেন বন্ধুরা। প্রথম দিনের মত আলোচনা সেখানে হয়তো থেমে যায়। কিন্তু এই চিন্তা ঘুরপাক খেতে থাকে বন্ধুদের মাথায়।

শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি টানতে বন্ধুরা মিলে গেলেন সেন্টমার্টিন ট্যুরে। সেখানে গিয়েও মজা মাস্তি কিংবা সমুদ্রস্নানের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে ফিরে আসতে থাকে ব্যবসা শুরুর পরিকল্পনা। ঢাকায় ফিরেই বন্ধুরা মিলে কাজ শুরু করে দিলেন, খুলে ফেললেন Gadget Monkey BD Members ফেসবুক গ্রুপ।

monkey2

আশার দোলাচলে চলতে শুরু

পার্টনারশিপ ব্যবসার প্রাথমিক উচ্ছ্বাস আর স্বপ্নের মধুচন্দ্রিমা শেষ হয়ে গিয়ে এবার সবার মাঝে দানা বাধে বন্ধুত্বের চিড় ধরার আশংকা। কিন্তু শৈশবের যে অটুট বন্ধনে বন্ধুরা বাঁধা পড়েছিলেন তা কোন সম্ভাবনায় ভাঙ্গন ধরাতে পারে নি। তাই সবার হাতে টাকা না থাকলেও সবাই সমান ভাগ করে ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে শুরু করলেন গ্যাজেট সোর্সিং এর কাজে। লোকাল মার্কেট থেকে প্রোডাক্ট নিয়ে গ্রুপে পোস্ট দিয়ে দিয়ে ক্রেতাদের কে আকর্ষণ করার কাজ চলতে থাকে পুরোদমে।

খুব একটা লাভের চিন্তা ছিল না মাথাতে শুরুতেই। সারাদিন ফেসবুকে উল্লেখযোগ্য সময় কাটানো এই তরুণরা বরং এন্টারটেইনমেন্ট এর সোর্স হিসেবেই প্রথম দিকে এই ব্যবসার কথা চিন্তা করেছিলেন। কথা প্রসঙ্গে জানতে চেয়েছিলাম আমরা ্পাঁচ বন্ধুর একজন রনির কাছে, কেন ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে বেচাকেনা? তিনি জানালেন, আসলে তাদের ইচ্ছা ছিল শুরু থেকেই কাস্টমারদেরকে বেস্ট সাপোর্ট দেওয়া। গ্রুপের মাধ্যমে যে Interaction এর সুযোগটা ছিল সবচেয়ে বেশী। ক্রেতাদের সাথে বন্ধু, ভাইয়ের মত সম্পর্ক গড়ে তোলা, প্রোডাক্টের যেকোন সমস্যায় তাদের তাৎক্ষণিক সাপোর্ট দেয়া এই ছিল তাদের ব্যবসার মূলমন্ত্র। আর তাই চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েছে তাদের গ্রুপের সদস্য সংখ্যা যা এখন প্রায় এক লক্ষ গ্যাজেটপ্রেমীর এক বিশাল পরিবার। মোবাইল এবং গ্যাজেট সংক্রান্ত যেকোন জিজ্ঞাসায় গ্যাজেট মাংকি এখন তারুণ্যের প্রথম পছন্দ।

সার্ভিস ব্যবসার এক বড় চ্যালেঞ্জের নাম হচ্ছে কোয়ালিটি ধরে রাখা। কোয়ালিটি হতে পারে পণ্যের, কোয়ালিটি হতে পারে আপনার ডেলিভারি টাইমের। মোদ্দাকথা কথা দিয়ে কথা রাখতে পারাটাই সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা। এইরকম প্রতিজ্ঞা প্রতিদিনই রেখে চলেছেন গ্যাজেট মাংকির বন্ধুরা। সার্ভিস ডেলিভারিতে যাতে কোন ব্যাঘাত না ঘটে তাই প্রাথমিক পুঁজির লভ্যাংশ দিয়ে নিজেরাই কিনে নিয়েছেন একটি মোটরসাইকেল।

পথের বাঁধা না হয় দূর হলো, কিন্তু প্রকৃতির বাঁধা? এখানেও অদম্য তারুণ্যের কাছে হার মেনেছে রুদ্র প্রকৃতি। ঝড় বৃষ্টি, কুয়াশা কিংবা রোদের ঝাঁঝালো আঁচ কোনটাই দমিয়ে রাখতে পারেনি তাদের। তাই রাত ১১ টা হলেও ঠিক ঠিক টাইম মত পৌঁছে যায় কাস্টমারের অর্ডার করা পণ্য।

সাফল্যের চৌকাঠে পা

প্রথম দফা বিনিয়োগে ব্যবসা জমে যাওয়ার পর এবার সবাই দ্বিতীয় ধাপে পা দিলেন। বিনিয়োগ করলেন আরও ৩০ হাজার টাকা সবাই মিলে। আর প্রোডাক্ট সোর্সিং ও ভাল হলো আগের থেকে। ব্যবসার যে প্রাথমিক শর্ত, “পথে নামলেই পথ চেনা হয়ে যায়” এই আপ্তবাক্যটি যেন খাপে খাপে মিলে গেলো মাংকি ব্রাদারদের সাথে। প্রোডাক্ট এখন আর লোকাল সোর্স থেকে না নিয়ে চলে গেলেন আরও গভীরে। তাই প্রোডাক্টের লাভের মার্জিন আগের চেয়ে পাকাপোক্ত হলো। একইসাথে সুলভে পণ্য কাস্টমারের কাছে তুলে দেওয়াও সহজ হলো। সব মিলিয়ে আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি “Band Of Brothers” দের। গ্রুপের চৌকাঠ পেরিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ডের একটি স্বতন্ত্র ই-কমার্স ওয়েবসাইটও বানিয়ে ফেলেছেন Storrea Platform ব্যবহার করে খুব সহজেই, অনলাইন ব্যবসার কার্যক্রম সেখান থেকেই পরিচালিত হচ্ছে। আর অনলাইন জগতের সীমানা পেরিয়ে ক্রেতার আরও কাছে আসতে দোকানও বসিয়ে ফেলেছেন ব্যস্ত শপিং মল বসুন্ধরা সিটির লেভেল ৫ এ।

হাল ছেড়োনা বন্ধু, বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে

গ্যাজেট মাংকির সফলতার গল্প আমাদের সামনে যুগ যুগান্তরের অনেক ধ্রুব সত্যকেই আবার জীবন্ত করে তোলে। ব্যবসার প্রাথমিক পুঁজি যে সাহস, সততা এবং ক্রেতা কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ এই তরুণের দল। ব্র্যান্ড এস্টাব্লিশ করার দুরন্ত আশা যে আদতে ব্যবসাকেও সফলতায় উত্তীর্ণ করে তারও উদাহরণ গ্যাজেট মাংকির এই অভাবনীয় সাফল্য। গ্যাজেট মাংকির এই পথচলা আমাদেরকে স্বপ্ন দেখায়; নতুন উদ্যোগে মাঠে নেমে পড়তে, নিজের সর্বস্ব বিনিয়োগ করে লেগে থাকলে সাফল্য যে আসবেই সেই ধ্রুব সত্যে আস্থা স্থাপনে।

 

 

আরো উদ্যোক্তাদের গল্প শুনতে চাই

(Visited 1,052 times, 1 visits today)
2

Comments