পৃথিবীতে যেন আবিষ্কার ও কর্মচাঞ্চল্যের এক মহোৎসব চলছে। প্রথাগত ধারণার বাইরে এসে মাস্ক, জাকারবার্গ, সের্গেই ব্রিন এর মত নতুনেরা চমক লাগানো সব আইডিয়া দিয়ে আগামী পৃথিবীর খোলনলচেই যেন পাল্টে ফেলছেন। এলন মাস্ক সেই ধারারই একজন বিশেষভাবে গণ্য লোক। পৃথিবীর ভাগ্য পরিবর্তনের চাবিকাঠি ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা শক্তিশালী দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের হাতে থাকলেও নতুন দিনের এই পার্শ্বনায়কেরাই হয়ে উঠছেন আগামী পৃথিবীর প্রচ্ছদচিত্র। তাদের হাত ধরেই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা পাচ্ছে নতুন মাত্রা। জীবন ধারণে, জীবন যাপনে আসছে বর্ণিল বৈচিত্র্যের ছোঁয়া।

এলন মাস্ক। নামটা কি চেনা চেনা লাগছে? কোথাও শুনেছেন?

আচ্ছা এখন যদি বলি পে-প্যাল, টেসলা মটরস? হুম, এই নামগুলো তো খুবই পরিচিত। বিশেষ করে যারা ইন্টারনেটে  নিয়মিত আউটসোর্সিং এর কাজ করেন, তাদের জন্য টাকা আদান প্রদানের এক অপরিহার্য মাধ্যম হল পে-প্যাল। চলুন আজ শুনি এলন মাস্কের জাদুকরী উদ্যোক্তা হয়ে উঠার গল্প।

এলন মাস্ক একজন চমৎকার সফল উদ্যোক্তা। যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই সোনা ফলিয়েছেন। পে-প্যাল, টেসলা মটরস সহ স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজি(SpaceX), জিপ২(zip2) এবং সোলার সিটির(SolarCity) কোফাউন্ডার। একই সাথে ওপেন এ.আই(OpenAI) এর কো-চেয়ারম্যান।

 

ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ শৈশব 

১৯৭১ সালে দক্ষিন আফ্রিকায় জন্ম নেয়া মাস্কের শৈশব ও স্কুল জীবন খুব একটা ভাল কাটেনি। কিন্তু শেখার আগ্রহ ছিল প্রচুর। দিনে ১০ ঘন্টার উপরে বই পড়তেন। পড়ার ধাত এতোই বেশি ছিল যে লাইব্রেরীর সব বই শেষ করে পুরো এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাই পড়ে ফেললেন।

মাস্ক একটা মানুষকে কম্পিউটারের সাথে তুলনা করেন। মানুষের হার্ডওয়ার হল তার শরীর আর মাথা। সফটওয়ার হল তার জ্ঞান আহরন ক্ষমতা, স্বভাব, ব্যক্তিত্ব। আর শেখাটা হচ্ছে সিমপ্লি মাথায় তথ্য আর বিচার-বিশ্লেষন করার পদ্ধতি ডাউনলোড করা। ক্লাসরুম শিক্ষার প্রতি তাই তার প্রধান অভিযোগ ছিল যে এটার “ডাউনলোড স্পিড অসম্ভব রকমের কম”! তার বেশিরভাগ শিক্ষাই বাসায় বসে পড়ে পড়ে।

নয় বছর বয়সে যখন প্রথম কম্পিউটার হাতে পান, সেটির মেমরি ছিল ৫ কিলোবাইট । “How to Program” গাইড মাত্র তিনদিনে আত্মস্থ করে ছোট্ট মাস্ক একটা ভিডিও গেম বানিয়ে ফেললেন  ‘ব্লাস্ট’ নামে, যেটা তার মতে- ফ্ল্যাপি বার্ডের চেয়ে বহুগুণে ভাল। ১৯৮৩ সালে গেমটি ৫০০ ডলারে কিনে নিয়েছিল একটি কম্পিউটার ম্যাগাজিন যখন মাস্কের বয়স মাত্র ১২। মায়ের কানাডার নাগরিকত্বের সুযোগে মাস্ক ১৯ বছর বয়সে আফ্রিকা ছেড়ে কানাডা চলে আসেন। এবং কিছু বছর পর কলেজ পরিবর্তন করে আমেরিকার পেন্সিলভানিয়া ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন।

মাথার ভিতরে স্বপ্ন নয়- কোন এক বোধ কাজ করে 

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই মাস্কের মাথায় ৫ টি বিষয় নিয়ে খেলা চলছিল যা তার মতে ভবিষ্যতের নিয়ামক হতে পারেঃ ইন্টারনেট, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, মহাকাশে বিস্তার, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা এবং জেনেটিক কোড পরিবর্তন প্রক্রিয়া। তবে মাস্ক নিজের জন্য ইন্টারনেটকেই প্রথমে বেছে নেন।

লাজুক মাস্ক সেই সময়ের ইন্টারনেট জায়ান্ট নেটস্কেপ এ সুযোগ না পেয়ে ভাই কে (কিম্বাল মাস্ক) নিয়েই প্রতিষ্ঠা করলেন নিজের একটি কোম্পানি জিপ২। জিপ২ একটি ওয়েব নির্ভর সফটওয়ার কোম্পানি যার কাজ ছিল ইন্টারনেটে একটি বিজনেস ডিরেক্টরি ও ম্যাপ তৈরি করা। সেই সময়ে ব্যাবসায়ীরা ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দিয়ে পয়সা খরচ করাকে বোকামি মনে করত, কিন্তু ধীরে ধীরে ইন্টারনেটের জনপ্রিয়তার সাথে সাথে জিপ২ ও ফুলেফেঁপে উঠল। বিশ্বখ্যাত কোম্পানি কমপ্যাক জিপ২ কে ১৯৯৯ সালে ৩০৭ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়। নিখুঁত ভবিষ্যতদ্রষ্টা মাস্ক মাত্র ২৭ বছরেই হন মিলিওনেয়ার।

মাস্ক এরপর ইন্টারনেটে বেঁচাকেনা, টাকা আদানপ্রদানের সুবিধার জন্য একটা ওয়েব ব্যাঙ্ক এর আইডিয়া নিয়ে উঠেপড়ে লাগেন। জিপ২ থেকে পাওয়া অর্থের তিন চতুর্থাংশই বিনিয়োগ করেন তার নতুন আইডিয়ার পেছনে। তৈরি হয় এক্স.কম (X.com)।

তাহলে পে-প্যাল কিভাবে আসল? আসলে পে-প্যাল হল দুইটি ফিনান্সিয়াল কোম্পানির যৌথ উদ্যোগ। এক্স.কম এর অফিস বিল্ডিং এই আরেকটি কোম্পানি ছিল, পিটার থিলের ইন্টারনেট ফিনান্সিয়াল কোম্পানি ‘কনফিনিটি’। ইন্টারনেটে অর্থ লেনদেনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বুঝতে পেরে প্রতিযোগিতা ছেড়ে দুটি কোম্পানি একসাথে হয়ে গঠন করে ‘পে-প্যাল’। ওয়েব জায়ান্ট ই-বে পে-প্যালকে কিনে নেয় ২০০২ সালে ১.৫ বিলিয়ন ডলারে, যেখানে সর্বোচ্চ শেয়ার-হোল্ডার হিসেবে ট্যাক্স বাদ দিয়েই মাস্ক উপার্জন করেন ১৮০ মিলিয়ন ডলার।

কিন্তু জীবন মানে যে থেমে থাকা নয়

এই পরিমাণ টাকা দিয়ে যে কেউ ২-৩ প্রজন্ম পায়ের উপর পা তুলে আয়েশি জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু এই টাকা দিয়ে মাস্ক কি করেছিল একবার আন্দাজ করুনতো? তিন তিনটি অচিন্তনীয় ও সাহসী প্রোজেক্টে বিনিয়োগ করে ফেললেন!

২০০২ সালে ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে একটা নতুন কোম্পানি গঠন করেন মাস্ক, ‘স্পেস এক্স’। একটি রকেট কোম্পানি! এর ভিশন হিসেবে বলা হয় যে, মহাকাশ ভ্রমনের খরচ সাধ্যের মধ্যে নিয়ে আসা এবং সামনের ১০০ বছরের মধ্যে ভিন্ন গ্রহে (মঙ্গল) মানুষের কলোনি তৈরি করা! (তার তৃতীয় চিন্তা ছিল মহাকাশে বিস্তার নিয়ে!) ২০০৪ সালে ৭০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন ইলেক্ট্রিক অটোমোবাইল কোম্পানি টেসলা তে। যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তেল ও গ্যাসের উপর চাপ কমিয়ে আনা। (লক্ষ করুন, তার দ্বিতীয় চিন্তাটি ছিল পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিয়ে!) এবং ২০০৬ সালে তার কাজিনের সাথে মিলে গঠন করে আরেকটি কোম্পানি ‘সোলার সিটি’। এটির লক্ষ্য সূর্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঘরদোরের জন্য ব্যবহৃত বিদ্যুৎ যা ফুয়েলের মাধ্যমে তৈরি করা হয়, তার পরিমাণ কমিয়ে আনা। এর মাধ্যমে তিনি চেয়েছেন তার পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ধারণ টির আরো বিস্তার ঘটাতে।

২০০২ থেকে ২০০৮, সবাই তাকে ভেবেছিল এক উদ্ভ্রান্ত বিলিয়নিয়ার, যে তার টাকা কিভাবে খরচ করবে বুঝে পাচ্ছেনা। কারন তার তিন-তিনটি সিদ্ধান্তই ছিল সময়ের তুলনায় অনেক আধুনিক, অনেক ব্যতিক্রম। কিন্তু ভবিষ্যৎ পড়ার নিখুঁত ক্ষমতাই যে তাকে প্রথমে বিলিয়নিয়ার বানিয়েছিল সে কথা ভুলে গেলে চলবেনা।

এই সময়টা যে তার জন্য খুব সুখকর ছিল তাওনা। স্পেসএক্স এর তিনটি রকেট কক্ষপথে পৌঁছনোর আগেই ধ্বংস হয়ে যায়। এই বিফলতার সময়ে বাইরে থেকে কেউ বিনিয়োগ করতে চাইছিলনা। তবু মাস্ক হাল ছাড়েননি। তিনি বলেছিলেন- আমার কাছে যা আছে তা দিয়ে হয়ত আরো একটি রকেট পাঠানো যাবে, এবং আমি সুযোগটি নিতে চাই। হয়ত এটাই স্পেসএক্সের জন্য শেষ সুযোগ।

টেসলার অবস্থাও যে ভাল তাও না। কোন বাড়তি বিনিয়োগ নেই। আমেরিকা সহ সারা বিশ্বে তখন অর্থনৈতিক ধ্বস। অটমোবাইল ইন্ডাস্ট্রি দেউলিয়া হওয়ার মুখে। গসিপ ম্যাগাজিনগুলোতে টেসলা কে বলা হচ্ছিল ২০০৭ এর নাম্বার ওয়ান ব্যর্থ টেক কোম্পানি! কিন্তু এলন মাস্ক ফিনিক্স পাখির মতই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এলেন ২০০৮ এর শেষে। স্পেসএক্সে তার চতুর্থ ও শেষ চেষ্টা সফল হল। রকেট ঠিকঠাক কক্ষপথে পৌঁছুল। নাসা পর্যন্ত ১.৬ বিলিয়ন ডলারের কন্ট্রাক্ট করল স্পেসএক্সের সাথে তাদের পরবর্তী ১২ টি রকেট উৎক্ষেপনের জন্যে। স্পেসএক্স ভালভাবেই দাঁড়িয়ে গেল।

আর টেসলা? এতেও বিনিয়োগ আসা শুরু করল। বাজারে আসল নতুন গাড়ি- টেসলা রোডস্টার।

২০০৮ থেকে এখন পর্যন্ত ইলন মাস্কের সবকটি প্রোজেক্টের উন্নতির গ্রাফ উর্ধ্বমূখী। প্রথম তিনটি ব্যর্থ অভিযানের পর স্পেসএক্স এখন পর্যন্ত ২০ টি রকেট উতক্ষেপন করেছে যার প্রত্যেকটিই সফল। নাসা তার নিয়মিত গ্রাহক। গুগল, ফিডেলিটির মত বড় বড় কোম্পানির বিনিয়োগ আছে এখন স্পেসএক্স এ।

টেসলার মডেল-এস তুমুল জনপ্রিয় হয়, গ্রাহক রেটিং এ ৯৯/১০০ এবং ন্যাশনাল হাইওয়ে সেফটি এডমিনিস্ট্রেশন এর রেটিং এ ৫/৫ পেয়ে আগের সব রেকর্ড ভেঙ্গে দেয়। আর সোলারসিটি এখন আমেরিকার সর্বাধিক সোলার প্যানেল সরবরাহকারী কোম্পানি। তারা এখন আমেরিকার সর্ববৃহৎ সোলার প্রস্তুত কারখানা বসাচ্ছে বাফালোতে। এবং এই তিন কোম্পানি মিলে কর্মীর সংখ্যা ত্রিশ হাজারেও বেশি!

পে-প্যাল, সোলারসিটি, স্পেসএক্স, টেসলা – চারটি ভিন্ন এবং উচ্চাকাংখী প্রোজেক্টকে সফল করা, একজন মানুষের পক্ষে কিভাবে সম্ভব? কি খায় সে? তার জীবনাচরণ কতটুকু অদ্ভুত– এই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় মাস্ক কে প্রায় প্রত্যেকটি সাক্ষাতকারে। এর উত্তর কি? কি করে তিনি সামলান এতো বড় বড় কোম্পানি? আপাতত মাস্ক পড়ে আছেন তার রকেটযাত্রা ও টেসলার কাজ নিয়েই। সোমবার যান লস অ্যাঞ্জেলস এ SpaceX এর তদারকিতে। মঙ্গল আর বুধবার তোলা থাকে Tesla র জন্যে। বৃহস্পতিবার আবার SpaceX। শুক্রবারটা অর্ধের করে ভাগাভাগি করে নেয় দুটো কোম্পানি। আর মাস্ক বিশ্বাস করেন তিনি Biological Barrier ভাঙতে পেরেছেন। দিনে ১৬ ঘণ্টা কাজ করা তার পক্ষে অসম্ভব কিছু নয়। একসাথে অনেকগুলো কাজ তিনি সমন্বয় করতে পারেন। নিজেকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখে ছুড়ে দিয়ে নিজের সর্বোচ্চটাই বের করে আনেন তিনি।

বাস্তবের নায়ক যখন পর্দায়

হলিউডের সাড়া জাগানো কমিক মুভি Iron Man কিংবা Avengers এ আয়রন ম্যান হিসেবে পর্দায় যে টনি স্টার্ককে দেখা যায় তা আদতে এই এলন মাস্কেরই প্রতিচ্ছবি। প্রখ্যাত অভিনেতা রবার্ট ডাউনি জুনিয়র এই চরিত্র করার আগে নিজে পরিচালকসহ সাক্ষাৎ করেছেন এলন মাস্কের সাথে। কারণ কমিক বুকের আয়রন ম্যান কে যেমন আবিষ্কারক কাম বিলিয়নিয়ার দেখানো হয় তার সবচেয়ে কাছাকাছি বাস্তব চরিত্র এলন মাস্ক ছাড়া যে আর কেউ নেই। তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কমিক বুকের আয়রন ম্যানের উপরে প্রলেপ দিয়েই রবার্ট ডাউনি জুনিয়র তৈরি করেছেন পর্দার আয়রন ম্যান।

Elon-Musk_Iron-Man

 

সবার মধ্যে সাফল্যের ক্ষুধা থাকে। নিজের উদ্যোগকে সফলতায় পরিণত করতে আমরা সবাই কমবেশি চেষ্টা করে থাকি। কিন্তু নিজের সামর্থ্যের শেষ সীমানায় নিয়ে গিয়ে আমরা কখনো কি নিজেকে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি ফেলি? এলন মাস্কের মত সাহসী উদ্যোক্তারা আমাদের কে সাহস দেখান উদ্যোক্তা হওয়ার সেই কঠিন পথ পাড়ি দিতে।

 

হতে চাই সফল উদ্যোক্তা

 

 

(Visited 1,256 times, 1 visits today)
1

Comments