লাভজনক একটি প্রোডাক্ট সোর্স আর বাজারে সেই প্রোডাক্টের চাহিদা; এই দুইয়েই তো ব্যবসার মূলকথা। তাই নয় কি? কিন্তু এতো সহজ ধাপেই যদি পার পাওয়া যেত তবে হয়তো আমাদের মধ্যে সবাই ব্যবসায়ীই হতেন। কিন্তু ব্যবসা যখন মানুষ এর সাথে তখন মানুষের অনুভূতি, আবেগ, বিশ্বাস, আস্থা এসবও কিছুটা আমলে নিতে হয় বৈকি। আর তাই অনাদিকাল থেকেই ব্যবসায় সফলতার চাবিকাঠি হয়ে এসেছে গ্রাহকের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা দখল করতে পারা। অনেক আশ্চর্য সুন্দর, কোয়ালিটি প্রোডাক্ট ও হয়তো আপনার ব্যবসাকে লাভের মুখ দেখাতে পারবেনা যদিনা আপনি ক্রেতার আস্থার জায়গাটি অর্জন করতে না পারেন। আর আজকে আমরা কথা বলবো ঠিক এরকম একটি আস্থা অর্জনের জায়গা নিয়েঃ Return & Exchange Policy Of Your Business.

 

রিটার্ন পলিসির উপর অনলাইন ব্যবসার সফলতা অনেকটাই নির্ভর করে। আপনার সম্ভাব্য ক্রেতার মনে এই প্রশ্ন আসতেই পারে যে আপনার পণ্য পছন্দ না হলে সেটা ফেরত দেবার জন্য তাকে কোন ঝামেলা পোহাতে হবে কিনা। আমেরিকার একটি সার্ভে তে দেখা গিয়েছে ৬৩% কনজিউমার অনলাইনে পণ্য কেনার আগে রিটার্ন পলিসি দেখে নেবে আর আপনি যদি যথাসম্ভব কম ঝামেলায় পন্যটি ফেরত নেন তাহলে ৪৮% কনজিউমার আপনার পণ্যটি বেশি করে কিনবে। আন্তর্জাতিক বাজারে রিটার্ন পলিসির গুরুত্ব বোঝা যায় জার্মানির একটি পরিসংখ্যান থেকে। সেখানে ৭২% কনজিউমার বেড়ে যাবে শুধু ঝামেলা বিহীন রিটার্ন পলিসি থাকলে।

অনলাইনে পণ্য কেনার সময় বেশিরভাগ ক্রেতাই অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণ থাকেন। কেননা একে তো তাকে শিপিং কস্ট গুনতে হচ্ছে, এর সাথে সে সামনাসামনি পণ্যটি যাচাই করার সুযোগটাও পাচ্ছে না। কাজেই সে যদি একটু খুঁতখুঁতে হয়, অবাক বা বিরক্ত হবেন না। আপনার যদি একটি সহজ সরল রিটার্ন পলিসি থাকে, এটা খুব শক্তিশালী প্লাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে।

আত্মবিশ্বাস বাড়াতে একটি গোছানো এবং বুদ্ধিদীপ্ত রিটার্ন এবং এক্সচেঞ্জ পলিসি টনিকের মত কাজ করে। আপনার নিজের,নিজের পণ্যের আর ক্রেতাদের উপর আস্থা রাখতে হবে। একটা স্টাডিতে দেখা যায়, ফ্রি শিপিং বা রিটার্ন পলিসির কারণে বিক্রয়ের হার ৫৮% থেকে ৩৪৮%-এ গিয়ে দাঁড়ায়।

একটি শক্তিশালী রিটার্ন পলিসি কাস্টমার ধরে রেখে আপনার রিটার্ন করার খরচটাও কমিয়ে দিবে(সত্যি কথা দ্বিগুণ লাভ)। ক্রেতা যদি আপনার পণ্য নিয়ে সন্তুষ্ট না-ও হয়,আপনার আন্তরকিতা তাকে আপনার উপর অসন্তুষ্ট করবে না।

 

বিশ্বাসযোগ্য একটি রিটার্ন এবং এক্সচেঞ্জ পলিসি লিখে ফেলুন আজই 

আপনার সাইটের রিটার্ন পলিসি আপডেট বা সংযোজন করার আগে কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর কৌশল মাথায় রাখতে হবে। আপনার প্রতিযোগীদের সহজেই পিছনে ফেলতে চান? বুদ্ধি খাটিয়ে রিটার্ন পলিসি তৈরি করুন; সাথে কথায় আর কাজে মিল রাখুন। কাস্টমারদের প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভাসিয়ে নিরাশ করবেন না। এক্ষেত্রে Honesty is the best policy থিওরি ফলো করাই যথার্থ হবে।

১.পলিসি নিয়ে লুকোচুরি খেলবেন নাঃ

সাইটে এসে কাস্টমারকে আপনার রিটার্ন পলিসি পাবার জন্য যেন হন্যে হয়ে খুজতে না হয়।ঢুকেই যেন দেখা যায় এমন জায়গায় রাখুন(যেমন মেইন মেনুতে অথবা এর আশে পাশে)। সব থেকে ভাল হয় যদি আপনি সেটা কনফার্মেশন ইমেইলের সাথে এটাচ করেন।আপনার পণ্য পছন্দ হোক আর নাই হোক, আপনি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে আপনি কাস্টমারদের পাশে আছেন,এতে কোন ক্ষতি নেই।

২.কখনো কোন অবস্থাতেই কপি পেস্ট করবেন নাঃ

এটা শুধু রিটার্ন পলিসির জন্য খাটে না, প্রোডাক্ট ডেসক্রিপশনেও কপি মারবেন না। টু দি পয়েন্টে সব কিছু সাজাবেন। অন্যের ব্যবসার রিটার্ন পলিসি কপি করে নিজের সাইটে বসিয়ে দিবেন না। রিটার্ন পলিসির পেজে যদি সম্ভব হয় কাস্টমার রিভিউ রাখার চেষ্টা করুন। আপনার সাইটের ভিজিটরদের প্রমাণ করে দিন যে আপনার পণ্য যদি কোন কারণে কারো পছন্দ নাও হয়, সেরা কাস্টমার কেয়ারটাই তারা পাবে।

৩.লিখুন সহজবোধ্য ভাষায়ঃ  

কাটখোট্টা ভাষা ব্যবহার করবেন না। আপনার সাইটে এসে মানুষের যেন ডিকশনারি খুলে বসতে না হয়। গুগলকে কনফিউজ করে দিলে আপনার SEO(Search Engine Optimization) নেমে যাবে। আর বাংলায়ও দিতে পারেন চাইলে আপনার পলিসি। সেটি বরং সহজে বোধগম্য হবে আপনার ক্রেতার জন্য।

৪.হুমকি ধামকি দেয়া থেকে বিরত থাকুনঃ

“You must”/ “You are required”/”We are not responsible” এধরনের কথা ব্যবহার করবেন না। আপনার পণ্য কেনাটা যেভাবে সহজ করবেন, ফেরত দেয়ার ক্ষেত্রেও ক্রেতাকে সেভাবেই সহযোগিতা করবেন। আপনার আন্তরিক মনভাবের জন্যই হয়তো সেই কাস্টমার আবারো আপনার কাছে ফিরে আসবে।

৫.এক্সচেঞ্জ পলিসি পরিস্কার রাখুনঃ

এক্সচেঞ্জের ক্ষেত্রে ক্রেতা আপনার কাছ থেকে কি আশা করতে পারে সেটা সোজাসাপটা বলে দিন। অনেকেই ১০০% রিফান্ড দিয়ে থাকেন, আপনাকে যে সেটাই করতে হবে এমন কোন কথা নেই। এটা নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করে দেখুন। বিভিন্ন অপশন দিয়ে দেখুন কোনটি আপনার ক্রেতারা বেশি পছন্দ করছে। এছাড়া কতদিনের মধ্যে কি প্রক্রিয়ায় রিফান্ড পাওয়া যাবে তার সুনির্দিষ্ট উল্লেখ থাকা চাই।

৬.স্টাফদের সচেতন রাখুনঃ

আপনার রিটার্ন পলিসির সাথে কাস্টমার কেয়ার স্টাফদের অবশ্যই আপ-টু-ডেট থাকতে হবে। ফলে পলিসি নিয়ে ক্রেতা বিক্রেতার মাঝে বিভ্রান্তি থাকবে না, পলিসি নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতা তৈরি হবে না এবং এতে করে স্টাফদের কর্মদক্ষতা বেড়ে যাবে কয়েকগুণে।

৭.ভুলের মাশুল দিতে প্রস্তুত থাকুনঃ

আপনি রিটার্ন পলিসি আপডেট করলেন, একজন ক্রেতা তার আগেই অর্ডার প্লেস করে দিল, এক্ষেত্রে রিটার্ন ও এক্সচেঞ্জের ক্ষেত্রে আপনার উচিত হবে পুরোনো পলিসি মেনে চলা। আর এক পণ্যের জায়গায় যদি আরেক পণ্য পাঠিয়ে বসেন,ক্ষমা চেয়ে বিনা খরচে আবার সঠিক পণ্যটি পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। এছাড়াও প্যাকিংয়ের ত্রুটির জন্য পণ্যের ক্ষতি হলে নিজ দ্বায়িত্বে তা সংশোধন করুন। দয়া করে নিজের দোষ ক্রেতাদের উপর ঝাড়বেন না।

 

আমরা যারা ছোট কোম্পানি তাদের উপায় কি?

ফ্রি শিপিং বা ১০০% রিফান্ড দিতে বড় বড় কোম্পানির গায়ে লাগে না। কিন্তু এখন আপনার কোম্পানি যদি ক্ষুদ্র বা মাঝারি লেভেলের হয়, ফ্রি সার্ভিস দেয়া একটু কঠিন হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে আপনি স্লো বাট স্টিডি থাকুন। আপনি এমন কিছু অফার করুন যাতে এটা স্পষ্ট থাকে যে আপনি আপনার যথাসাধ্য করছেন কাস্টমারদের জন্য। দিনশেষে আপনারও যেন ভর্তুকির পরিমান সহনীয় থাকে।

১.হিসাব করে রিফান্ডের একটা মার্জিন দাঁড় করানঃ আপনি আপনার বাজেট অনুযায়ী একটি লিমিট দাঁড় করাবেন, যেমন ধরুন আপনি পলিসিতে রাখলেন ২০০০ টাকার বেশি দামি কিছু কিনলে ১০০% রিফান্ডের অপশনটি থাকবে। বা এক্সচেঞ্জের ক্ষেত্রে ক্রেতাকে শিপিং চার্জ বহন করতে হবে।
২.অফলাইন স্টোর থাকলে সেটা কাজে লাগানঃ আপনার যদি নিজের একটি স্টোর থাকে তাহলে এক্ষেত্রে খুব সহায়ক হয়। যেমন রিফান্ড পলিসি হিসেবে আপনি এটা রাখতে পারেন যে, কাস্টমার স্টোরে এসে রিফান্ড/এক্সচেঞ্জ সেবা ফ্রিতে পেতে পারেন।
৩.পিক আওয়ার কাজে লাগানঃ ঈদের সময় স্বভাবতই বেচাকেনা পিকে থাকে। আপনি ফ্রি শিপিং অথবা ১০০% রিটার্ন পলিসি সেই সময় প্রোমোশনাল অফার হিসেবে রাখতে পারেন। আপনার শিপিং এর খরচ ব্যবসা থেকেই উঠে আসবে।

৪.রিটার্ণ পলিসি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিঃ পণ্য বিক্রয়ের সময় স্বপ্রনোদিত হয়ে আপনার রিটার্ণ/এক্সচেঞ্জ বা রিফান্ড পলিসি সম্পর্কে ক্রেতাকে অবগত করুন। আপনার এই স্বদিচ্ছা ক্রেতার মাঝে বাড়তি আস্থা এবং আত্মবিশ্বাস জাগাবে।

আপনার ওয়েবসাইটে যদি এই রকম বাড়তি Return & Exchnage Policy পেইজ বানানো ঝামেলার মনে হয় তবে Storrea দিয়ে সহজেই বানিয়ে নিতে পারেন আপনার ওয়েবসাইটের জন্যে এরকম একটি পেইজ। এছাড়া চাইলে চেক আউট প্রক্রিয়াতেও পলিসি পেইজ সংযুক্ত করতে পারবেন।

 

হতে চাই একজন সৎ ও সফল অনলাইন ব্যবসায়ী

(Visited 637 times, 1 visits today)
2

Comments