নিজের একটি ই-কমার্স ওয়েবসাইট যে কোন অনলাইন ব্যবসার প্রথম ধাপ। খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যেই একজন অনলাইন ব্যবসায়ী তার ব্যবসার ই-কমার্স ওয়েবসাইট তৈরী করে পণ্য বিক্রি শুরু করে দিতে পারেন। কিন্তু সত্যিকথা বললে অনলাইন ব্যবসা শুধুমাত্র ওয়েবসাইটে পণ্য তুলে ধরাই নয়, বরং এর সাথে জড়িত থাকে আরো নানান বিষয়। ক্রেতার সাথে একটি আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা, একটি সহজ এবং বাধাহীন অর্ডার ফুলফিলমেন্ট প্রসেস, ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কন্টেন্ট মার্কেটিং এবং প্রমোশন স্ট্র্যাটেজি ইত্যাদি আরো অনেক কিছুর উপর আপনার অনলাইন ব্যবসার সার্বিক সফলতা নির্ভর করে। ঠিক একই ভাবে এই জায়গাগুলোতেই অবহেলা এবং অব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবসা বাধাগ্রস্থ হয়। আজ অনলাইন ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলোর সঠিক বাস্তবায়ন এবং ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হবে।

কাস্টমারের সাথে বিশ্বাস এবং আস্থার সম্পর্ক তৈরী

আপনার ওয়েবসাইট দেখতে যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন আপনি যদি অনলাইন ব্যবসায় নতুন এসে থাকেন তবে কাস্টমারের সাথে বিশ্বাস এবং আস্থার সম্পর্কটি তৈরী করা আপনার জন্য বেশ বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। স্বাভাবিকভাবেই অনলাইন ব্যবসায় বিক্রেতা সম্পর্কে ক্রেতার কোন ধারণা থাকেনা, ক্রেতার কাছে আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা তুলে ধরতে এবং ক্রেতার আস্থাভাজন হতে কিছুটা সময় আপনার লাগবেই। সম্পর্কটি দ্রুত একটি কার্যকরী পর্যায়ে নিয়ে যেতে বিক্রেতাকে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হবে।

আপনার পণ্যের মান এবং ত্রুটিহীন সেবা দিয়ে কাস্টমারকে আকৃষ্ট করতে হবে। নিজের ওয়েবসাইটে আপনার ব্যবসার ঠিকানা, ইমেইল অ্যাড্রেস বা ফোন নাম্বার কখনো গোপন করবেন না। About Us এ নিজের এবং ব্যবসা সম্পর্কে বিস্তারিত লিখুন, কাস্টমারদের Testimonial নিয়ে ওয়েবসাইটে উপস্থাপন করুন। আপনার ব্লগও অনেকসময় ক্রেতার সাথে সুসম্পর্ক তৈরীতে সহায়তা করতে পারে। আপনার নিয়মিত কাস্টমারদের জন্য লয়ালিটি পয়েন্ট/ডিসকাউন্টের অপশন রাখতে পারেন যা আপনার এবং কাস্টমারের মধ্যে আস্থার সম্পর্কটি দীর্ঘস্থায়ী করবে।

ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা

অনেক বিক্রেতা অনলাইনে পণ্য বিক্রয় করেন ঠিকই কিন্তু নিজের ই-কমার্স ওয়েবসাইটের সার্বিক নিরাপত্তার ব্যাপারে উদাসীন থাকেন। এই যুগে হ্যাকার এবং অনলাইন ফ্রডরা অসাধু মতলবে যে কোন ওয়েবসাইটে হানা দিতে পারে। আপনার ব্যবসা ছোট বা বড় যাই হোক না কেন নিরাপত্তার ব্যাপারে সচেষ্ট হোন। আপনার কাস্টমারদের ব্যক্তিগত তথ্য যদি একবার জনসম্মুখে চলে আসে আপনি তাদের আস্থা হারাবেন যা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নাও হতে পারে। আপনার ওয়েবসাইটের বিভিন্ন সিকিউরিটি থ্রেট থেকে পেমেন্ট অন্য জায়গায় ট্রান্সফার করে নেয়া, ওয়েবসাইট লক করে দেয়া, অযাচিত কন্টেন্ট দিয়ে ওয়েবসাইট ভরিয়ে ফেলা ইত্যাদি অনেক অনাকাংখিত ব্যাপার ঘটতে পারে।

আপনার ওয়েবসাইটের নিরাপত্তাজনিত দূর্বলতাগুলো খুঁজে বের করুন। ওয়েবসাইট হোস্টিং প্রোভাইডার এবং শপিং কার্ট সিস্টেম চেক করুন। নিয়মিত পাসওয়ার্ড পরিবর্তন করুন। পুরো সিস্টেমের আর্কিটেকচার কাস্টমাইজেবল রাখার চেষ্টা করবেন। নিয়মিত ডেটা ব্যাক আপ রাখবেন। আপনার কম্পিউটার এবং সার্ভারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এরকম সফটওয়্যারও ব্যবহার করতে পারেন। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ টেকনিকাল স্পেশালিষ্ট এর সহায়তা নিন।

অর্ডার প্রসেসিং

কাস্টমারের থেকে পণ্যের অর্ডার পেলে সেটি প্রসেস করতে হবে, এটি আপাত দৃষ্টিতে খুব জটিল কিছু নয়। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই যে ব্যাপারে কাজ করতে হবে তা হলো পণ্য সঠিকভাবে প্যাকিং করা যেন পরিবহনের সময় সেটি কোনভাবেই ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। বিভিন্ন পণ্যের জন্য বিভিন্ন প্যাকেট বা বক্স ব্যবহার করা যেতে পারে। এরপর দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য কুরিয়ারের মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পণ্য পৌছে দেয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ। ডেলিভারীর নির্ধারিত সময়ের হেরফের ক্রেতা কখনোই ভাল চোখে দেখেন না। সময়মত পণ্য ডেলিভারী বর্তমানে কাস্টমার সার্ভিসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

এই অর্ডার প্রসেসের পুরো প্রক্রিয়াটি বেশ কিছু ধাপে  হয়ে থাকে। যেমন প্রথমেই দরকার আপনার লোকবল, যারা অর্ডার পাওয়া মাত্র দ্রুত সময়ের মধ্যে পণ্য সঠিকভাবে প্যাকিং করে ডেলিভারীর জন্য প্রস্তুত রাখতে পারবে। এরপর আপনার প্রয়োজন হবে একটি নির্ভরযোগ্য কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের সাথে পার্টনারশিপ করা যারা দ্রুততম সময়ে ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দেবে। আপনি নিজেও নিজের ডেলিভারী টিম পরিচালনা করতে পারেন, সেক্ষেত্রে হয়তো আরো নিষ্ঠার সাথে নিজস্ব পরিকল্পনায় ডেলিভারী সিস্টেমটি ম্যানেজ করতে পারবেন। আর সবশেষে লাগবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি ট্র্যাক করার জন্য একটি সফটওয়্যার। অর্ডার রিসিভ, ইনভেন্টরি ম্যানেজ, ক্যাশ অন ডেলিভারী পেমেন্ট ইত্যাদি কাজগুলো সফটওয়্যার দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করলে পুরো প্রক্রিয়াটি গুছিয়ে সম্পন্ন করতে পারবেন।

পণ্য পরিবর্তন এবং রিফান্ড পলিসি

অর্ডার প্রসেসিং এর সাথেই ই-কমার্স ব্যবসার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটি চলে আসে তা হলো অর্ডারকৃত পণ্য পরিবর্তন এবং রিফান্ড পলিসি। আপনার ব্যবসায় যদি পণ্য পরিবর্তন এবং রিফান্ড পলিসি না থাকে তবে কিন্তু ক্রেতার সাথে আস্থা এবং নির্ভরতার সম্পর্কে বেশ কিছুটা ঘাটতি রয়েই যায়। বর্তমানে কাস্টমার সার্ভিসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এই রিফান্ড পলিসি। বাংলাদেশে ই-কমার্স খাতে বিক্রেতাগণের কাছে পণ্য পরিবর্তন এবং রিফান্ড পলিসি অনেক সময়ই উপেক্ষিত থাকে, প্রচুর ভুয়া অর্ডারও আসে যার কারনে ক্রেতা বিক্রেতার আস্থার জায়গাটায় ঘাটতি আছে। আবার নিম্নমানের পণ্য রিসিভ করে ক্রেতাও পণ্য পরিবর্তন বা রিফান্ড খুঁজে থাকেন। তাই আপনি প্রকৃত ক্রেতার সন্তুষ্টি চান, ক্রেতাকে কেনাকাটার একটি সুন্দর অভিজ্ঞতা দিতে চান তবে এই ধরনের পলিসি আপনার অবশ্যই রাখা উচিৎ।

আপনার পণ্য পরিবর্তন এবং রিফান্ডের পলিসি থাকুক বা না থাকুক সেই তথ্যটি অবশ্যই ওয়েবসাইটে উল্লেখ থাকতে হবে যেন ক্রেতা সহজেই আপনার পলিসি সম্পর্কে অবগত হোন এবং পরবর্তীতে কোন ধরনের ভূল বোঝাবুঝির সুযোগ না থাকে। আপনি যদি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হয়ে থাকেন হয়তো রিফান্ড পলিসি ম্যানেজ করা আপনার জন্য কঠিন, তাই পলিসি না থাকলেও সেটি সুনির্দিষ্ট করে বলুন, আর চেষ্টা করুন কিভাবে দ্রুত ব্যবসা বড় করবেন এবং কাস্টমারকে পূর্ণাঙ্গ একটি শপিং ফ্লেক্সিবিলিটি দিবেন।

মোবাইল কমার্স

স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট এখন মানুষের হাতে হাতে। তাই বিক্রেতাকে তার ওয়েবসাইট এবং পুরো ব্যবসার পরিকল্পনা এই মোবাইল ডিভাইসকে মাথায় রেখেও করতে হবে। প্রথমেই যেটি চাই তা হলো আপনার ই-কমার্স ওয়েবসাইটটি হতে হবে মোবাইল ফ্রেন্ডলি। যে কোন মোবাইল ডিভাইসে যে কোন ব্রাউজারে যেন আপনার ওয়েবসাইটটি চলে সেই চ্যালেঞ্জিং কাজটি করতে হবে। আরেকটি ব্যাপার হলো মোবাইল অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে টাকাপয়সার লেনদেনের ব্যবস্থা। আজকাল অর্থ লেনদেনের জনপ্রিয় মাধ্যম বিভিন্ন ব্যাংকের মোবাইল সেবা। আপনার পেমেন্ট সিস্টেমে এগুলোর সংযোজন খুবই জরুরী।

মোবাইল ডিভাইসে আপনার ওয়েবসাইটের সহজবোধ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। মোবাইলেও কাস্টমার আপনার ওয়েবসাইটে সচ্ছন্দ কিনা খেয়াল করুন, মোবাইলে নেভিগেসন এবং চেক আউট প্রক্রিয়া সহজ রাখুন। ক্রেতাকে মোবাইলেও ভাল শপিং অভিজ্ঞতা দিতে চাইলে পর্যাপ্ত টেস্টিং করেই ওয়েবসাইটটি বাজারে আনুন। মোবাইল অ্যাপ তৈরী করেও আপনি ব্যবসায় অন্য মাত্রা যোগ করতে পারেন। আর মোবাইলে লেনদেনের প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন, সে জন্য আপনার সিস্টেমে কার্যকরী ট্র্যাকিং অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে যেন ক্রেতা বিক্রেতার মধ্য কোন ধরনের ভূল বোঝাবুঝি হওয়ার সুযোগ না থাকে।

শেষকথা

আমাদের দেশে ই-কমার্স একটি বিপুল সম্ভাবনাময় খাত। আপনি যতটা জেনে বুঝে, গুছিয়ে, প্রস্তুতি নিয়ে শুরু করতে পারবেন ততটাই দ্রুত আপনার ব্যবসাকে বড় এবং জনপ্রিয় করে তুলতে পারবেন। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই উপরের বিষয়গুলোতে বাড়তি মনযোগ দিন। এটি নিশ্চিত যে ব্যবসার পুরোটা সময় জুড়েই আপনি এসব চ্যালেঞ্জের সামনে পরবেন, তাই এই বাঁধাগুলো যেন সহজে অতিক্রম করতে পারেন সেভাবেই প্রস্তুতি নিন।

 

I am interested to start online business

(Visited 2,229 times, 1 visits today)
1

Comments