(এই লেখাটি আবু আশরাফ মাসনুন এর ফেসবুক পেইজের একটি নোট থেকে লেখকের অনুমতিক্রমে সংগৃহীত। লেখক পেশায় একজন সফটওয়ার প্রকৌশলী। ট্রান্সেন্ডিও এর ফাউন্ডার; গুগল বিজনেস গ্রুপ খুলনা এর কো-ম্যানেজার। বর্তমানে ইউএসএ ভিত্তিক একটি স্টার্টআপ Local Staffing LLC তে Senior Full Stack Engineer হিসেবে কর্মরত আছেন।
ইকমার্স ব্যবসা যেই বা যারা করছেন তাদের সবার জন্যই ইমেইল মার্কেটিং একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। আপনার সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে আপনার পণ্যের নিত্যনতুন খবর ও জনপ্রিয় অফারগুলো পাঠাতে ইমেইল মার্কেটিং এর জুড়ি নেই। আর ইমেইল মার্কেটিং এর উপর এই লেখাটি বাংলা ভাষায় লেখা অন্যতম তথ্যবহুল লেখা। লেখক তার অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ে আমাদের ব্যবসায়ীদের উপযোগী করেই সাজিয়েছেন এই অসাধারণ লেখাটি। লেখাটির গুরুত্ব বিবেচনায় স্টোরিয়ার পাঠকদের জন্যে আবার পুনর্মুদ্রণ করা হল। ) 
আমি গত প্রায় ১ বছর ধরে আমার বর্তমান কর্মস্থলে একটা “ইমেইল প্লাটফর্ম” নিয়ে কাজ করছি । এই প্লাটফর্মের মূল কাজ নানা চাকরি বাকরির খবর টার্গেট অডিয়েন্সের কাছে ইমেইল করা। এখানে আমাদের ব্যবহারকারীরা নির্দিষ্ট ধরনের জবের জন্য সাইন আপ করে । এরপর আমরা তাদেরকে জব এ্যালার্ট পাঠাই । এই কাজ করতে গিয়ে ভাবলাম আমার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু লিখে ফেলি । আমি চেষ্টা করবো পয়েন্ট আকারে কিছু পরামর্শ দিতে ।

জিমেইল ব্যবহার করবেন না

জিমেইল এর ফ্রী পপ কিংবা আইম্যাপ সার্ভিস দিয়ে খুব সহজেই ইমেইল পাঠানো যায় । একারণে অনেকেই ইমেইল অটোমেশনের জন্য প্রথমেই জিমেইল ব্যবহার করা শুরু করে । জিমেইল ব্যবহার করার দুটো সমস্যা আছে –
  • জিমেইল এর নির্দিষ্ট লিমিট আছে
  • ফ্রী-ইমেইল সার্ভিস ব্যবহার করে গনহারে ইমেইল করলে আপনার “রেপুটেশন” নিয়ে সমস্যা হবে । রেপুটেশন জিনিসটা নিয়ে একটু পরে আলোচনা করবো । দ্বিতীয় পয়েন্টটার কারনে আমাদের উচিৎ যে কোন ফ্রী ইমেইল প্রোভাইডার এ্যাভয়েড করা ।

নিজের সার্ভার থেকে ইমেইল করবেন না

যারা cPanel ব্যবহার করে অভ্যস্ত এদের অনেকেই পিএইচপির mail() ফাংশন ব্যবহার করে সার্ভার থেকে ইমেইল করতে চান । আবার অনেকে আছেন একটু বেশী অভিজ্ঞ, যারা পোস্টফিক্স কিংবা অন্য কোন ইমেইল সার্ভার রান করে সেখান থেকে ইমেইল করতে আগ্রহী । এই পদ্ধতিতে দুটো সমস্যা হতে পারে – ১) আপনার ইমেইল বেশীরভাগ ক্ষেত্রে স্প্যাম এ যাবে ২) আপনার সিস্টেম স্কেইল করবে না । আজকাল বেশীরভাগ ইমেইল সার্ভিসই তার ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার খাতিরে নানা ধরনের প্রটোকল ব্যবহার ও চেক করে । আমাদের জন্য এই জিনিসগুলো ঠিক ঠাক মত কনফিগার করা সহজ কথা না । আর যখনই কনফিগারেশন ভুল হবে তখনই ইমেইল ইনবক্সে না যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে । আর যখন আপনার এক সাথে অনেক বেশী ইমেইল পাঠানোর দরকার হবে, তখন দেখা যাবে আপনার এসএমটিপি সার্ভার বটলনেক । আপনি হয়তো সেকেন্ডে ১০ হাজার ইমেইল কিউ করছেন কিন্তু সে ডেলিভার করে পারছে না। এইটা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাড়াবে পরবর্তীতে ।

ট্র্যান্জাকশনাল ইমেইল সার্ভিস প্রোভাইডার ব্যবহার করুন

সেন্ডগ্রিড, ম্যান্ড্রিল, মেইলগান এর মত অনেক জনপ্রিয় সার্ভিস আছে যারা ইমেইল পাঠানোর কাজটা সহজ করে দিবে । এসব ক্ষেত্রে আপনাকে জাস্ট আপনার ডোমেইনটা ভেরিফাই করতে হবে । বাকি যেসব জরুরী জিনিসপত্র তা সব এরাই হ্যান্ডল করবে আপনার জন্য ।

রেপুটেশন বিল্ড আপ করুন

ম্যাস ইমেইলিং এর ক্ষেত্রে রেপুটেশন টা বিল্ড আপ করা জরুরী । আপনার ইমেইল এ্যাড্রেস বা ডোমেইন যদি একবার স্প্যামার হিসেবে (কু)খ্যাতি পেয়ে যায় তাহলেই সর্বনাশ । জিমেইল এর মত সার্ভিস গুলো রেপুটেশন নিয়ে খুবই সিরিয়াস । তাই এই ব্যাপারে নজর দিতে হবে । রেপুটেশন ভালো করার জন্য এই স্টেপ গুলো নিতে পারেন –
  • আপনার ইমেইল প্রোভাইডার সার্ভিস যদি ডেডিকেটেড আইপি প্রোভাইড করে তাহলে চেষ্টা করুন ডেডিকেটেড আইপি নিয়ে নিতে
  • অনেক প্রোভাইডার আপনাকে SPF/DKIM/TXT ইত্যাদি ডিএনএস রেকর্ড সেট করতে বলবে । আবার অনেকে এগুলো জাস্ট সাজেশন হিসাবে রাখবে । আপনার উচিৎ অবশ্যই এগুলো ঠিক মত সেটাপ করা । এগুলো খুবই জরুরী এবং করা খুব কঠিন কিছু না ।
  • প্রত্যেক ব্যবহারকারীকে আলাদা ভাবে ইমেইল পাঠান । কখনোই সবাইকে এক সাথে To বা Cc ফিল্ডে যোগ করবেন না ।
  • শুরুতেই একবারে বেশী ইমেইল পাঠাবেন না । আস্তে আস্তে ভলিউম বাড়ান । যেমন: প্রথম দিনে ২ হাজার, দ্বিতীয় দিনে ৪ হাজার – এভাবে আস্তে আস্তে পাঠানো ইমেইলের পরিমান বৃদ্ধি করুন ।
  • ইমেইলে অবশ্যই আনসাবস্ক্রাইব অপশন রাখতে হবে । এটা আপনি করতে পারেন অথবা আপনার প্রোভাইডারের উপর নির্ভর করতে পারেন । আজকাল সব প্রোভাইডারই অটোম্যাটিক্যালি এই লিংক টা এ্যাড করে দেয় ফুটারে । তাই আপনার কষ্ট না করলেও চলে ।
  • যেসব ইউজার আনসাবস্ক্রাইব করে, এদেরকে আর ইমেইল পাঠানো যাবে না । অনেক প্রোভাইডারই ইন্টারনালি এটা মেইনটেইন করে । অর্থাৎ, কেউ আনসাবস্ক্রাইব করলে, আপনি চাইলেও তাদের ইমেইল পাঠাতে পারবেন না । এটা একটা ভালো ফিচার । তবে এটার উপর নির্ভরশীল হবেন না । ওয়েবহুক ব্যবহার করে আনসাবস্ক্রাইব, বাউন্স, স্প্যাম ইত্যাদি ইভেন্ট হ্যান্ডল করুন আর আপনার লিস্ট থেকে ঐ ইমেইল গুলো বাদ দিয়ে দিন । ছোট খাটো বিজনেস বা ক্যাম্পেইনের জন্য আলাদা করে ডাটাবেইজ বানানো ও এই ইভেন্ট হ্যান্ডল করা বাড়তি ঝামেলা হতে পারে । তাই এসব ক্ষেত্রে প্রোভাইডারের বিল্ট ইন লিস্ট ব্যবহার করার চেষ্টা করুন । তাহলে ওরা অটোম্যাটিক্যালি আপনার হয়ে এই ইভেন্ট গুলো হ্যান্ডল করবে, লিস্ট আপ-টু-ডেইট রাখবে ।
  • সম্ভব হলে এই ইমেইলটি আপনি কেন পাঠাচ্ছেন সেটা ফুটারে ছোট্ট করে উল্লেখ করুন । যেমন: You’re receiving this email because you signed up for our email alerts. * অবশ্যই অবশ্যই কাউকে জোর করে বা কারও সম্মতি না নিয়ে ইমেইল পাঠাবেন না । যদি কেউ আপনার ইমেইল নিয়ে রিপোর্ট করে বা যদি গনহারে লোকজন আপনার ইমেইলকে স্প্যাম হিসেবে মার্ক করা শুরু করে তাহলে আপনার রেপুটেশন শেষ ।
  • যদি আপনি নিয়মিত ইমেইল পাঠাতে চান (যেমন: মেইলিং লিস্ট, ডেইলি ইমেইল এ্যালার্ট) তাহলে ঐ ইউজার সাইন আপ করার সময়ই একটা ওয়েলকাম ইমেইল পাঠিয়ে দিন । অর্থাৎ সরাসরি তাকে রেগুলার ইমেইল পাঠানো শুরু করবেন না ।
  • ইমেইলে HTML ভার্সনের সাথে অবশ্যই ব্যাসিক টেক্সট ভার্সনও পাঠাতে হবে । অনেক সার্ভিস আছে যারা অটোম্যাটিক্যালি এটা করে দিবে আপনার জন্য ।
  • ইমেইলের কন্টেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ । অপ্রয়োজনীয়ভাবে ইমেইজ ব্যবহার করবেন না । পর্যাপ্ত পরিমানে টেক্সট কন্টেন্ট থাকা জরুরী । অনেকে আছেন পুরা ইমেইলই একটা ইমেইজ আকারে পাঠান । এইটা খুবই নেগেটিভ রেপুটেশন ক্যারি করে ।
  • এইচটিএমএল মেইল পাঠালে অবশ্যই মার্ক আপ চেক করে নিবেন । ভাঙ্গা-চোরা এইচটিএমএল কেউই পছন্দ করে না ।
  • কন্টেন্ট পার্সোনালাইজ করার চেষ্টা করুন । যেমন, যাকে ইমেইল পাঠাচ্ছেন, তার নাম ধাম সহ সুন্দর করে গ্রিট করুন । মেসেজের কন্টেন্টও যতটা পারা যায় প্রত্যেক ব্যবহারকারীর জন্য ইউনিক করার চেষ্টা করুন ।
  • একাধিক টেম্প্লেট ব্যবহার করুন । টেম্প্লেটের ভ্যারিয়েশন রাখা ভালো ।
সর্বোপরি বিচার বিবেচনা করে ইমেইল করুন । আপনার ইমেইলে কেউ বিরক্ত হলে সেটার ইফেক্ট পড়বে আপনার রেপুটেশনে । এবং তার উপর নির্ভর করবে আপনার ইমেইল ইনবক্সে পৌছাবে কিনা ।

দ্রুত ইমেইল পাঠানো

আপনি যদি সিঙ্গল প্রসেস দিয়ে ইমেইল পাঠান তাহলে সেটা স্লো হবেই । ইমেইল দ্রুত পাঠাতে চাইলে মাল্টিপল থ্রেড ব্যবহার করুন । যেসব ল্যাঙ্গুয়েজে মাল্টি থ্রেডিং এর সুযোগ নেই সে সব জায়গায় একাধিক প্রসেস রান করুন । প্রথমেই আপনার সব ইমেইল এ্যাড্রেস কোন একটা মেসেজ কিউতে স্টোর করে নিন । আমি ব্যক্তিগতভাবে আয়রন এমকিউ ব্যবহার করি । আপনি চাইলে রেডিসও ব্যবহার করতে পারেন । এরপর একটা প্রোগ্রাম লিখে ফেলুন যেটা এই কিউ থেকে ইমেইল গুলো পিক করবে আর তাদের ইমেইল করে দিবে ।
অনেক প্রোভাইডার তাদের এপিআই এর মাধ্যমে বাল্ক ইমেইল পাঠানোর সুযোগ দেয় । এক্ষেত্রে আপনার একটি টেম্প্লেট থাকবে । আপনি এপিআই কল করার সময় প্রত্যেক ইমেইল এ্যাড্রেস এর জন্য যে ফিল্ড গুলো পরিবর্তন হবে সেটা পাস করে দিবেন । প্রমোশনাল ইমেইলের জন্য বাল্ক ইমেইল টা খুবই কাজের ।

এ্যানালিটিক্স ও মনিটরিং 

আপনার ইমেইল গুলো ইনবক্সে পৌছায় কিনা সে বিষয়ে নজর রাখুন । ইমেইল ওপেন রেট ও ক্লিক রেট খেয়াল করুন । এগুলো কমতে থাকলে প্রয়োজন মত আপনার ইমেইলগুলোর কন্টেন্ট বা টেম্প্লেট পরিবর্তন করুন । ওপেন এবং ক্লিক রেট ভালো থাকা খুবই জরুরী ।

ইমেইল এ্যাড্রেস ভেরিফাই করে নিন 

অনেক সময় দেখা যায় ব্যবহারকারীরা ইনভ্যালিড ইমেইল এ্যাড্রেস দিয়ে সাইন আপ করে । এই ধরনের এ্যাড্রেসে ইমেইল করে আপনার ডেলিভারি রেইট কমে যাবে, অনেক সময় রেপুটেশনও আক্রান্ত হয় । তাই প্রথমবার ইমেইল করার আগে অবশ্যই “Kickbox” বা “Email Oversight” এর মত সার্ভিস গুলো ব্যবহার করে ইমেইল এ্যাড্রেস ভেরিফাই করে নিন ।

ইউআরএল ব্র্যান্ডিং করুন

সম্ভব হলে ইমেইলে পাঠানো সব লিংক এর ইউআরএলই আপনার ডোমেইনে যাতে যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা । আমাদের সিস্টেমে আমরা নিজেদের ইউআরএল শর্টেনার ডেভেলপ করে নিয়েছি এই কাজের জন্য ।
আমার ডেভেলপ করা ইমেইল প্লাটফর্মটি বর্তমানে প্রতিদিন দুইবার প্রায় ২ লক্ষ ইমেইল সেন্ড করে, ৩০ মিনিটের মধ্যে । অর্থাৎ সারাদিনে আমরা প্রায় ৪ লক্ষ ইমেইল এ্যালার্ট পাঠাই । এছাড়াও নানা ধরনের প্রমোশনাল ইমেইল ডেলিভার করা হয় আর ১ লাখের মত । ইমেইল কিউ করা এবং পাঠানোর জন্য আমরা এ্যামাজনের ইসি-টু ব্যবহার করি । ইমেইল গুলো স্টোর করা হয় আয়রন এমকিউ তে । আমাদের ডেডিকেটেড ক্লাস্টার আছে ওদের প্রেমিজে । মেইল ডেলিভারির জন্য আমরা ম্যান্ড্রিল ব্যবহার করি । প্লাটফর্মটি ডেভেলপ করা পাইথন থ্রি-তে । লগিং এবং মনিটরিং এর জন্য আমরা ইএলকে ব্যবহার করি । বড় ধরনের সমস্যা হলে অটোম্যাটিক্যালি স্ল্যাকে নোটিফিকেশন আসে ।

রিসোর্সের লিস্ট ইমেইলের জন্য

দ্রুত জনপ্রিয় হওয়া অনলাইন কেনাকাটার এই সময়ে নিজের অনলাইন স্টোরের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন অনেকেই। ফেইসবুক পেইজ ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের মার্কেটিং এর পাশাপাশি ইমেইল মার্কেটীং বহুল ব্যবহৃত ও পরীক্ষিত একটি অনলাইন মার্কেটিং টুল। বিশ্বজুড়ে বড় বড় কোম্পানি এখনো তাদের অফার, ছাড়, নতুন পণ্যের আগমন এগুলো ইমেইলের মাধ্যমে তাদের ক্রেতাদের কে জানিয়ে থাকেন। এবং ইমেইল এর মাধ্যমে পণ্য বিক্রির হারও বেশ সন্তোষজনক। তবে আর বসে থাকা কেন? নিজের একটি অনলাইন স্টোর বানিয়ে আজ আপনিও শুরু করে দিন পুরোদমে বেচাকেনা। মার্কেটিং, প্রোডাক্ট সোর্সিং, কাস্টমার কেয়ার সব কিছুর সুষম সমন্বয়ে আপনিও হতে পারেন সময়ের সফল উদ্যোক্তার মুখ।

 

চাই নিজের ইকমার্স ওয়েবসাইট

 

(Visited 756 times, 1 visits today)
0

Comments